
আইসিসির এপ্রিলের সেরা নাহিদ রানা
মে ১৫, ২০২৬
হাম ও হামের উপসর্গে আরো ১২ শিশুর মৃত্যু
মে ১৫, ২০২৬অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত, বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা উঠে এসেছে। তিনি পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত শেষ করার উদ্যোগের কথা বলেন। একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে জোর দেওয়ার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও নীতিগত ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
“পূর্ববর্তী সরকার” কারা—একটি অস্পষ্টতা
মন্ত্রী মহোদয়ের বক্তব্যে “পূর্ববর্তী সরকার” বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে—৫ আগস্ট ২০২৪-এর পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার, নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ববর্তী কোনো প্রশাসন—এটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। এই অস্পষ্টতা নীতিগত আলোচনা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে অর্থনীতিবিদদের একটি শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নতুন প্রশাসন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা এটাও দেখিয়েছেন যে, সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই অংশটি মন্ত্রীর বক্তব্যে অনুপস্থিত থাকায় একটি অসম্পূর্ণ চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে বলে মনে হয়।
প্রকল্প যাচাই-বাছাই: ইতিবাচক কিন্তু অসম্পূর্ণ পদক্ষেপ
মন্ত্রী ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর যৌথ সিদ্ধান্তে কিছু চলমান প্রকল্প বন্ধ এবং কিছু প্রকল্প দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রকল্প গ্রহণের আগেই একটি সুস্পষ্ট জাতীয় নীতিমালা থাকা জরুরি।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প নির্বাচন, অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণ হয় রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বা স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই শুধু প্রকল্প বন্ধ বা শেষ করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রকল্প গ্রহণের জন্য স্বচ্ছ, অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক এবং ফলাফলভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।
বাস্তবায়িত প্রকল্পের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ
নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত একটি দিক হলো—ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা ও ব্যবহার।
প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না, ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বড় অংশই অকার্যকর হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, এসব অব্যবহৃত বা আংশিক ব্যবহৃত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে যে ব্যয় হয়, তা অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
কক্সবাজার রেলস্টেশনের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেসের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে বলে জানা যায়। পরিকল্পনায় পর্যটকদের জন্য আবাসন, লাগেজ সুবিধা ও ফুড কোর্টের মতো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। স্থানীয় স্বার্থগোষ্ঠী বা বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তবে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হবে না।
একইভাবে কর্ণফুলী টানেল সংলগ্ন রিসোর্ট প্রকল্পেও একই চিত্র দেখা যায়। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হলেও পর্যটক আকর্ষণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার না থাকায় এটি কার্যত রক্ষণাবেক্ষণ নির্ভর একটি খাতে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের প্রকল্পে রাজস্ব আয়ের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় বাড়ছে।
এই বাস্তবতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, প্রকল্প গ্রহণের সময় সম্ভাব্য ব্যবহার, বাজার চাহিদা এবং পরিচালনা মডেল যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন—
প্রকল্প গ্রহণের আগে বাধ্যতামূলক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (feasibility study)
প্রকল্প শেষ হওয়ার পর বাধ্যতামূলক কার্যকারিতা মূল্যায়ন
বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে সম্পৃক্ত করা
দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ মডেল নির্ধারণ
বিশেষ করে পর্যটন ও অবকাঠামো খাতে বিদেশি ও দেশীয় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করলে প্রকল্পের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ: ইতিবাচক দিক
মন্ত্রী শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা নীতিগতভাবে ইতিবাচক। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে জোর দেওয়ার পরিকল্পনা শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে বরাদ্দ বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না বা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।
তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে স্বতন্ত্র অডিট, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
অর্থবছরের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশে বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছর ব্যবস্থাটি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাজেট অনুমোদনের পর অর্থছাড়, এরপর প্রকল্প শুরু এবং বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে অনেক প্রকল্প বর্ষাকালসহ প্রতিকূল মৌসুমি পরিস্থিতির মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হয়, যা দক্ষতা ও গুণগত মানে প্রভাব ফেলে।
এ কারণে অর্থবছর পুনর্বিন্যাস বা বাস্তবায়ন ক্যালেন্ডার আরও নমনীয় করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
উপসংহার
সার্বিকভাবে বলা যায়, বর্তমান অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন টেকসই করতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ বা বরাদ্দ বাড়ানো নয়, বরং বিদ্যমান প্রকল্পের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি কাঠামো প্রণয়ন করা অপরিহার্য।
অতএব, উন্নয়ন কৌশলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—“কম ব্যয়ে বেশি ফল” এবং “প্রকল্প নয়, ফলাফল কেন্দ্রিক উন্নয়ন ব্যবস্থা” প্রতিষ্ঠা করা।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


