
মির্জা আব্বাসের সুস্থতা কামনা করে নাসীরুদ্দীন বললেন—‘কামব্যাক কমরেড’
মে ৭, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধবিরতি ‘কার্যকর’ দাবি ট্রাম্পের
মে ৮, ২০২৬এক দশক আগেও ঢাকা শহরে বিপুলসংখ্যক কাকের উপস্থিতি ছিল এক চিরচেনা দৃশ্য। কিন্তু কমতে কমতে ঢাকার অগণিত কাক এখন গণনাযোগ্য।
কাক যেমন কমেছে, তেমনি আরো অনেক প্রজাতির পাখি এখন ঢাকায় রীতিমতো দুর্লভ। দুই দশক আগেও ঢাকায় দেখা মিলত যে মালকোহা বা বন কোকিলের, তার সংখ্যাও এখন হাতেগোনা। নগরায়ণের অতিরিক্ত চাপ, বায়ুদূষণে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, বাসস্থান ও খাবারের অভাবে মূলত শহর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে একই রকম পরিস্থিতি দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের কারণে আশঙ্কাজনকভাবে পাখির প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বংশবৃদ্ধি না হওয়ায় হ্রাস পাচ্ছে পাখির সংখ্যা। পাশাপাশি গাছপালা ও জলাশয় কমার কারণেও সংকটে পড়েছে পাখির জীবনধারণ।
দেশের পাঁচটি বড় শহরের ২৩৮ প্রজাতির ৩ হাজার ৬০১টি পাখি নিয়ে দুই বছরব্যাপী একটি গবেষণায় পক্ষিকুলের হারিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় শনাক্তের চেষ্টা করেছেন গবেষকরা। গবেষণাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা—এ পাঁচটি শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় গবেষকরা পাখির জীবন পর্যবেক্ষণ করেছেন। নগরায়ণের চাপে কীভাবে পাখির জীবনধারণ হুমকির মুখে পড়েছে, তা নির্দিষ্ট করতে নগর এলাকাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। উচ্চমাত্রায় নগরায়িত এলাকা, যেখানে সবুজ ও জলাশয় একেবারেই নেই বা সামান্য পরিমাণে রয়েছে। মধ্যম নগরায়িত এলাকা, যেখানে কিছু সবুজ ও জলাশয় রয়েছে। এর বাইরে নগরীর প্রান্তসীমা বা কম নগরায়িত এলাকা, যেখানে সবুজ ও জলাশয় তুলনামূলক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, ২৩৮ প্রজাতির পাখির মধ্যে সবচেয়ে কম প্রজাতি পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রায় নগরায়িত এলাকায়। এমন এলাকায় পাওয়া গেছে ১৩৬টি প্রজাতি। মধ্যম নগরায়িত এলাকায় ১৮৫ প্রজাতি এবং কম নগরায়িত এলাকায় ১৮৩ প্রজাতির পাখি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নগরায়ণের ঘনত্ব যত বেশি, পাখির প্রজাতি সেখানে তত কম। হিসাবে দেখা যায়, মধ্যম ও কম নগরায়িত এলাকার তুলনায় উচ্চমাত্রায় নগরায়িত এলাকায় পাখির প্রজাতির উপস্থিতি ২৫ শতাংশ কম।
সংশ্লিষ্ট গবেষক দলের প্রধান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা ২৩৮টি প্রজাতির ৩ হাজার ৬০১টি পাখি নিয়ে গবেষণা করি। এমন কিছু পাখি আমরা পেয়েছি, যেগুলো বেশি উচ্চমাত্রার নগরায়িত এলাকায় দেখা না গেলেও মধ্যম ও নিম্নমাত্রার নগরায়িত এলাকায় দেখা গেছে। এর মানে হলো নগরায়ণের তীব্র চাপে তারা নগর ছেড়ে চলে গেছে। এমন পাখির প্রজাতির সংখ্যা ২৫ শতাংশ। যেমন ঢাকার উচ্চ নগরায়িত এলাকা থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে রাজ ঘুঘু, চন্দনা টিয়া, শঙ্খচিল, শামুকখোল, রাতচোরা, কোয়েলসহ আরো অনেক প্রজাতির পাখি।’
শহরগুলোয় একই প্রজাতির পাখি যেমন চড়ুই, কাক বা চিল তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, ৫০টি কাক দেখা গেলেও প্রজাতি কিন্তু একটিই। রাজশাহীতে সর্বোচ্চসংখ্যক প্রজাতির দেখা মিলেছে। এ শহরটিতে ১৬৭ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এর পরই রয়েছে ঢাকার অবস্থান। এখানে ১৬০ প্রজাতির, সিলেটে ১০৭, খুলনায় ৮৮ এবং চট্টগ্রামে ৭৫ প্রজাতির পাখি দেখা যায়।
গবেষকরা বলছেন, নগরায়ণ যত তীব্র হচ্ছে, পাখির বৈচিত্র্য ততই কমছে। বিশেষ করে উচ্চ ঘনত্বের নগর এলাকায় নাগরিক পাখি বা যেসব পাখি গাছপালা ছাড়া কংক্রিটের ছাদে, কার্নিশে বসবাস করতে পারে এমন পাখিই বেশি দেখা যায়। যেমন চড়ুই। এসব পাখি নগরে বেশি দেখা যায় বলে মনে হতে পারে যে আরো পাখি আছে। কিন্তু আসলে নগরে পাখির বৈচিত্র্য কমছে। কাক, চড়ুইয়ের বাইরে অন্য সব পাখি তেমন দেখা না যাওয়া সুস্থ নগরীর সূচক নয় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষণায় ২৩৮ প্রজাতির মধ্যে যে ১০ প্রজাতির পাখি বেশি দেখা গেছে তার মধ্যে রয়েছে ভুবন চিল, পাতি কাক, ভাত শালিক, গো-শালিক, চড়ুই, ফিঙে, বুলবুলি, তিলা ঘুঘু, কাঠ শালিক ও কানি বক।
গবেষণায় রাজশাহী ও ঢাকায় পাখির প্রজাতি বেশি পাওয়া গেলেও এ দুই শহরেই পাখিরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২৫ শতাংশ পাখি তো মূল নগর এলাকা থেকে চলে গেছে। এর মধ্যে এখন মাত্র ১০ প্রজাতির পাখি নগরে বেশি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ পাখিগুলো নানা কারণেই ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে বায়ুদূষণ পাখির প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করছে। যদি নগরীতে পর্যাপ্ত জলাশয় থাকত, তাহলেও পাখির বেঁচে থাকার লড়াইটা একটু সহজ হতো। কিন্তু নগরীর জলাশয়গুলো হয় বেদখল, নয় নোংরা। ফলে পাখির জন্য কোনো অর্থেই অনুকূল পরিবেশ আমাদের শহরগুলোতে নেই।’
গবেষণায় পাখির প্রজাতি ও বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার পেছনে বড় কারণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণ সরাসরি পাখির শ্বসনযন্ত্রের ক্ষতি করা ছাড়াও প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং খাবার সংগ্রহের স্বাভাবিক আচরণে বিঘ্ন ঘটায়। এছাড়া দূষিত এলাকায় পোকামাকড় কমে যায়, ফলে পতঙ্গভুক পাখিরা তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে। একইভাবে দূষণে পাখির বাসা তৈরির বিভিন্ন উপাদানও প্রকৃতিতে কমে যাচ্ছে। খাবার ও বাসা তৈরির উপকরণের অভাব পাখিদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম মনিরুল এইচ খান বলেন, ‘মানুষের জন্য যেমন দূষণের সহনীয় মাত্রা রয়েছে। পাখির জন্যও রয়েছে। সে মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যায় তখন মানুষের মতো পাখিরও বেঁচে থাকা কষ্ট হয়ে যায়। পাখিও তো ওই দূষিত বায়ুতেই শ্বাস নেয়। তার শ্বাসযন্ত্র আক্রান্ত হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এতে করে পাখির বাচ্চাগুলো বেশি বিপদে পড়ে।’
পাখি গবেষকদের মতে, বায়ুদূষণ প্রধানত পাখির হরমোন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে এবং প্রজনন পরিবেশ বিষাক্ত করে বংশবিস্তারের হার কমিয়ে দেয়। বাতাসে থাকা বিষাক্ত ক্ষুদ্র কণা (পিএম ২.৫) এবং ভারী ধাতু যেমন সিসা বা পারদ সরাসরি পাখির রক্তে মিশে প্রজনন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। যার ফলে পাখির গান গাওয়ার ক্ষমতা (সঙ্গী খোঁজার জন্য জরুরি) এবং ডিম পাড়ার প্রবণতা হ্রাস পায়। এছাড়া অ্যাসিড বৃষ্টির কারণে মাটি থেকে ক্যালসিয়াম ধুয়ে যাওয়ায় পাখিরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, ফলে ডিমের খোসা অত্যন্ত পাতলা ও ভঙ্গুর হয় যা বাচ্চা ফোটার আগেই ভেঙে যায়। দূষণের কারণে পাখির প্রধান খাদ্য পোকামাকড়ের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পুষ্টির অভাবে অনেক পাখি প্রজনন মৌসুমে ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয় অথবা জন্মানো বাচ্চারা দুর্বলতার কারণে মারা যায়।
জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাখি সংরক্ষণেও আমরা কাজ করছি। শহরে যদি সবুজ থাকে, জলাশয় থাকে, বায়ুদূষণ না থাকে তাহলে পাখিসহ সব ধরনের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা পাবে।’
বায়ুদূষণের পাশাপাশি নগরীর হর্ন, নির্মাণ কর্মযজ্ঞ, সড়কবাতি, উচ্চ শব্দের বাজনা পাখির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে নগর পরিকল্পনায় পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করার তাগাদা দিচ্ছেন গবেষকরা।
ঢাকার নগর এলাকায় পাখির বৈচিত্র্য এবং বিচরণ ফেরানোর বিষয়টি সরকারের পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এটা সত্য যে অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে ঢাকায় পাখিসহ অনেক প্রাণিকুলই হারিয়ে গেছে। এ বিষয়টি আমরা ড্যাপে গুরুত্ব দিয়ে ঢাকায় পাঁচটি আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করেছি। পার্কগুলো রমনা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো বড় এলাকাজুড়ে নির্মাণ করতে হবে। পার্কগুলো কোথায় হবে, কেমন প্রকৃতির হবে তার বিস্তারিত ড্যাপে বলা আছে। সত্যিকার অর্থে ঢাকায় এখনো গুটিকতক যে পাখি ও প্রাণী দেখা যায় সেগুলো রমনা, টিএসসি, বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো এলাকাতেই। পাঁচটি আঞ্চলিক পার্ক নির্মাণ হলে শুধু পাখি নয়, ঢাকার বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব। আমরা নগর পরিকল্পনায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছি। বাস্তবায়নের কিছু উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।’


