সুশাসনের অভাবে সরকার ও শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছিল নেপালের তরুণরা
এপ্রিল ৩, ২০২৬
তেলের সংকট নেই, আমদানি-সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী
এপ্রিল ৩, ২০২৬
সুশাসনের অভাবে সরকার ও শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছিল নেপালের তরুণরা
এপ্রিল ৩, ২০২৬
তেলের সংকট নেই, আমদানি-সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী
এপ্রিল ৩, ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তা ভ্রাম্যমাণ আদালত আর পুলিশ দিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে ভয়াবহ অস্থিরতা দেখা দেবে তা অনুমেয়ই ছিল। বিশেষত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ সরাসরি আমদানি করে। তাই বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এক বিরাট সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এ সংকট শুধু বাংলাদেশের একার নয়। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানিনির্ভরতা প্রায় সব দেশেরই কমবেশি আছে। বিশেষত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোও একই ধরনের সংকটে পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেক দুর্বল। তাই এ সংকট বাংলাদেশের জন্য তীব্রতর।

কিন্তু সরকারের এ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপ থেকে মনে হচ্ছে না যে তাতে বেশ চিন্তার ছাপ আছে। যুদ্ধ শুরুর এক মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো জ্বালানি তেলের মূল্যের কোনো সামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হলেও বাংলাদেশে এখনো এর প্রভাব তেমন পড়েনি। অবশ্য প্রতিবেশী দেশসহ এশিয়ার অন্য প্রায় সব দেশ কমবেশি মূল্য বাড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের এ নীতিকে একেবারে অযৌক্তিক বলা যাবে না। কারণ জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়লে খাদ্যপণ্য, পরিবহনসহ সব খাতে প্রভাব পড়ে। তাতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা স্বল্প আয়ের তাদের ক্ষতি হয় বেশি। তবে ঢালাওভাবে মূল্য কমিয়ে রাখলে উচ্চ আয়ের শ্রেণীরাও সুবিধা ভোগ করে থাকেন। তাতে কিছুটা হলেও অর্থের অপচয় ঘটে। এ অপচয় সমন্বয় করার স্বার্থে সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়। এ ভর্তুকির বাড়তি অর্থ সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যায়।

সার্বিকভাবে জ্বালানি খাতে অপচয়ের একটি আনুমানিক হিসাব দেয়া যাক। জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতি অনুযায়ী, দেশে মার্চজুড়ে ১০০ টাকায় ডিজেল বিক্রি হয়েছে। অথচ এ ডিজেল কিনতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের খরচ হয়েছে ১৮৯-১৯০ টাকা। এদিকে অকটেন বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায় যেখানে প্রকৃত ক্রয় খরচ ১৫০-১৫১ টাকা। এ রেটে ভর্তুকি দিতে থাকলে জ্বালানিমন্ত্রীর মতে, জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত ৩১ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের খরচ হবে। এ ভর্তুকির পুরোটাই যদি স্বল্প আয়ের মানুষ, কৃষি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় হয় তাহলে সেটা দেশের জন্য মঙ্গল হতো। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।

এ সমস্যা সমাধানে ভারত খাতভিত্তিক মূল্য সমন্বয়ের পথ অবলম্বন করছে। স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি চাপ না বাড়িয়ে সরকার মূলত নির্দিষ্ট কিছু জ্বালানি এবং বৃহৎ শিল্প খাতের জন্য তেলের দাম বাড়িয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থাগুলো তাদের প্রিমিয়াম জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২-৩ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। তবে সাধারণ পেট্রল ও ডিজেলের দাম সাধারণ ভোক্তাদের জন্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যারা বেশি টাকা দিয়ে প্রিমিয়াম গাড়ি বা বিলাসবহুল পণ্য ব্যবহার করেন, তাদের ওপর দামের বোঝা চাপানো হয়েছে। আর সাধারণ গণপরিবহন ও কৃষি খাতে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম স্থিতিশীল রাখা হয়েছে। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সরাসরি বিক্রি করা ‘বাল্ক ডিজেল’-এর দাম প্রতি লিটারে প্রায় ২২ টাকা (বা প্রায় ২৫ শতাংশ) বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরেক প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং আইএমএফের কঠিন শর্তের মুখে পড়ে আছে। তাই দেশটি যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় লিটারপ্রতি প্রায় ৫৫ রুপি পর্যন্ত দাম বাড়ায়। ফলে পাকিস্তানে জীবনযাত্রার ব্যয় এক মাসে অনেক বেড়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। নানা বাস্তবতায় বাংলাদেশও যে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা রাখতে পারবে না, এমনটি বলা যায়। এক্ষেত্রে ভারতের মতো বিলাসবহুল গাড়ির জ্বালানির দাম সমন্বয় করলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। অন্যদিকে ডিজেলের ব্যবহার যেহেতু গণপরিবহন এবং কৃষিতে রয়েছে, সেসব খাতে মূল্যবৃদ্ধি সীমিত রাখা যেতে পারে। বাজারভিত্তিক জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় ছাড়াও আরো বাজারবহির্ভূত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। যেমন শ্রীলংকা ২০২২ সালের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের পর জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। তারা ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ নামক একটি কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল রেশন ব্যবস্থা চালু করে। এভাবে যানের ধরন অনুযায়ী তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যবস্থার সাফল্য হলো, এটি কেবল মজুদদারিই কমায়নি বরং জ্বালানির পাম্পে দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি ও কালোবাজারি প্রায় সম্পূর্ণ নির্মূল করেছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে সাপ্তাহিক ছুটি একদিন বাড়িয়ে সপ্তাহে চার কর্মদিবস নির্ধারণ করা হচ্ছে। সরকারি অফিসে এসির তাপমাত্রা ২৬-২৭ ডিগ্রিতে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভিয়েতনাম বিমান চলাচল কমিয়ে এবং ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি জোরদার করে জ্বালানি সাশ্রয় করছে। বড় বড় আইটি কোম্পানিগুলো কর্মীদের নিজস্ব খাবার বহন করতে উৎসাহ দিচ্ছে। এভাবে এলএনজির সাশ্রয় হচ্ছে।

বাংলাদেশেও এ ধরনের কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার মূলত বিশাল অংকের ভর্তুকি এবং প্রশাসনিক কঠোরতার ওপর নির্ভর করছে। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে কাজ করবে না। বড় আকারের এ ভর্তুকি দীর্ঘ সময় ধরে চললে জাতীয় রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি করবে। অন্যদিকে মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট রুখতে সরকার র‍্যাব-পুলিশ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। প্রায় ৩০০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পুরো বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং জরিমানা করছেন। বাংলাদেশে মজুদ ঠেকাতে র‍্যাব-পুলিশ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। প্রতিবারই বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দৃশ্যমান সাফল্য আসেনি।

বাজারে পণ্যের সত্যিকারের ঘাটতি থাকলে এবং সরকার কৃত্রিমভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভবিষ্যতে চড়া লাভের প্রত্যাশা জাগে এবং মজুদ করার প্রবণতা বাড়ে। এভাবেই মূলত মজুদ করা পণ্য কালোবাজারি করে বিক্রির চেষ্টা শুরু হয়। আবার পার্শ্ববর্তী দেশেও যখন একই পণ্যের সংকট থাকে তখন সেখানে পাচারের প্রবণতাও বাড়ে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকটকে অপরাধজনিত সংকটে পরিণত হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ করে সমাধানের চেষ্টা হয়। এটা প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। এ প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ অনেক সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি আরো বাড়িয়ে দেয়। শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে পুলিশ বা ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে ধরপাকড় করার চেয়ে ডিজিটাল মনিটরিং এবং চাহিদার যৌক্তিক বণ্টন অনেক বেশি কার্যকর।

তাছাড়া বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি মাসে একবার জ্বালানি তেলের মূল্যের সমন্বয় ঘটে। স্বাভাবিক সময়ে মাসে একবার ঠিক আছে, কিন্তু এখনকার সংকটে যখন প্রায় প্রতিদিন দাম বাড়ছে তখন মাসে একবার মূল্যবৃদ্ধি বাজার বড় ধরনের মজুদের প্রণোদনা জোগায়। বিক্রেতারা বিক্রয় কমিয়ে বা বন্ধ করে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে কখন নতুন মূল্য নির্ধারিত হবে এবং অধিক মুনাফা করা যাবে। এ ধরনের সংকটের সময় সাপ্তাহিক অথবা তিন-চারদিন অন্তর দাম সমন্বয়ের দিকে যাওয়া উচিত, তবে তা সব ধরনের জ্বালানির জন্য নয়। এসব স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এ জ্বালানি সংকট নিয়ে বাংলাদেশকে এখন থেকেই ভাবতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর বেশির ভাগের তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট অনেক বেশি হওয়ার কারণ হলো, আমাদের প্রায় শতভাগ নির্ভরতা জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েলের ওপর। সেখানে ভারতের নির্ভরতা ৯০ শতাংশের মতো, পাকিস্তানের ৮১, শ্রীলংকায় ৭৭ আর সবচেয়ে কম নেপালে ২৬ শতাংশ।

নেপাল ও ভুটান তাদের ভৌগোলিক সুবিধা এবং জলবিদ্যুৎ সম্পদকে ২০২৬-এর জ্বালানি সংকটে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে। এ দেশগুলো কেবল তেল আমদানিনির্ভর না থেকে তাদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ভারতে রফতানি করছে এবং ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে। এ আঞ্চলিক সহযোগিতা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়াতে সাহায্য করছে এবং জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে। তারা মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিয়ে একটি টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার মডেল তৈরি করছে যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। বাংলাদেশের ২০০৮ সালে গৃহীত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্পর্কিত নীতিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় যে ২০২০ সালের মধ্যে সৌর ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ খাতে জ্বালানি সরবরাহ ১০ ভাগে উন্নীত করা হবে। কিন্তু দেড় যুগ পরও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। অথচ এক যুগ আগেও বাংলাদেশকে সোলার এনার্জিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হতো আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতির কারণে।

পরিস্থিতি শুধু অপরিবর্তিত নয়, আরো খারাপ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে সরকারি উদ্যোগের অভাবে। অন্যদিকে সেই ঘাটতি কমাতে ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর তরলীকৃত গ্যাস আমদানি। শুধু তা-ই নয়, কয়লা আমদানির ওপরও নির্ভরতা বেড়েছে। এসবই বাংলাদেশকে যেকোনো জ্বালানি সংকটে বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রেখেছে। তাই এ মধ্যপ্রাচ্য সংকট আমাদের জন্য একটা বড় সাবধানবাণী হিসেবে দেখতে পারি। এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *