
ট্রাম্পের দাবি ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা, তেহরানের অস্বীকার
মার্চ ২৪, ২০২৬
কলম্বিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্ত: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৬
মার্চ ২৪, ২০২৬হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দেয়া ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম থেকে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো স্থগিত রাখতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
তার এ ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ১৩ শতাংশের বেশি। খবর এপি, রয়টার্স, আল জাজিরা ও গার্ডিয়ান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো স্থগিতের সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনার সাফল্যের ওপর। যদিও যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আদতে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর আগে শনিবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিষয়ে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে ইরানের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়ন করলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পানি ও জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়া হবে।
ইরানি গণমাধ্যমগুলো এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংবেদনশীল পানি ও বিদ্যুৎ স্থাপনার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে।
এ নিয়ে চলমান উদ্বেগের মধ্যেই ইরানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালানো স্থগিত রাখতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরকে নির্দেশ দেয়ার কথা জানালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বৈরিতার সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাধান নিয়ে গত দুই দিনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
যদিও ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এমন কোনো আলোচনা বা সংলাপ চলছে না। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহরে প্রকাশিত ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের উদ্দেশ্য হলো জ্বালানির দাম কমানো এবং তার সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় নেয়া।
ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সিও এক অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ—কোনো ধরনের যোগাযোগই হয়নি। সূত্রটি দাবি করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইসরায়েলের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার হুমকি দেয়ার পর ট্রাম্প পিছু হটেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সূত্র ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তাদের কোনো তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা স্থগিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ দেয়ার খবরে গতকাল বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে ১৩ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম কমেছে ব্যারেলে প্রায় ১৭ ডলার বা ১৫ শতাংশ। গতকাল প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট বিক্রি হচ্ছিল ৯৬ ডলারে। একই সময়ে মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম কমেছে ব্যারেলে ১৩ ডলার বা প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই গতকাল ৮৫ ডলার ২৮ সেন্টে বিক্রি হচ্ছিল। এর আগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গিয়েছিল।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর গতকাল ওয়াল স্ট্রিটে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোন্স ফিউচার্স সূচক দিনের স্বাভাবিক লেনদেন শুরুর আগেই ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণাকে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রশমনের প্রয়াস হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তবে এতে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বাধা আসতে পারে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট বলে মনে হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, ট্রাম্প যুদ্ধ আগেভাগেই শেষ করতে পারেন, যা ইরান ও হিজবুল্লাহর জন্য সুবিধাজনক হবে। এমনকি ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলোও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকা অবস্থায় যুদ্ধ শেষ করাকে অনেকটা কৌশলগতভাবে আত্মসমর্পণের সঙ্গে তুলনা দিচ্ছে।
এ অবস্থায় ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাজি করাতে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য চাপ আসতে পারে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বার্তা সংস্থা এপির প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানে দেড় হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। লেবাননে এ সংখ্যা সহস্রাধিক। এছাড়া ইসরায়েলের ১৫ জনের ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনাসদস্যের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থলে ও সাগরে প্রচুর বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। লেবানন ও ইরানে বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখো মানুষ।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে ইরানের মধ্যপ্রাচ্যের পানি অবকাঠামোয় হামলা চালানোর হুমকি। এটি বাস্তবায়ন করলে দেশগুলোয় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। গার্ডিয়ানে এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সংবেদনশীল বেসামরিক অবকাঠামোগুলোর অন্যতম হলো পানি লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্লান্ট। এগুলো ব্যবহার করে ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ ও অন্যান্য খনিজ অপসারণ করে সেটিকে পানযোগ্য করা হয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর টিকে থাকার জন্য প্লান্টগুলো অপরিহার্য। শুষ্ক মরুভূমিতে গড়ে ওঠা এসব দেশের বিস্তৃত আধুনিক নগর, আবাসন ও শিল্প খাত এ পানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সেখানে বৃষ্টিপাত খুবই কম। বড় হ্রদ বা নদীসহ প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস খুবই সীমিত।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে পানির প্রাপ্যতা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগ। এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গোটা বিশ্বের মোট স্থাপিত পানি লবণমুক্তকরণ সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে পানীয়জলের মোট সরবরাহের ৭০ শতাংশ আসে ডিস্যালিনেশন প্লান্ট থেকে। কুয়েত, ওমান ও ইউএইর ক্ষেত্রে এ হার যথাক্রমে ৯০, ৮৬ ও ৪২ শতাংশ। ডিস্যালিনেশন প্লান্টগুলোয় হামলা শুরু হলে দেশগুলোর বড় শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষ স্থানান্তর হতে পারে। এছাড়া পানিসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রেশনিংও চালু করতে হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পর্যটন, শিল্প খাত ও ডেটা সেন্টার।
এমন প্রেক্ষাপটে এসব অবকাঠামোয় ইরানি হামলার আশঙ্কা দেশগুলোয় বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। তবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) গতকাল এক বিবৃতির প্রেক্ষাপটে অনেকেই ধারণা করছেন, দেশটি এখন আগের হুমকি থেকে সরে এসেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে গতকাল প্রচারিত আইআরজিসির বিবৃতিতে ট্রাম্পের হুমকি বাস্তবায়ন করলে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কেন্দ্রগুলোয় হামলা চালানো হবে ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি যেসব অর্থনৈতিক, শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোয় আমেরিকানদের অংশীদারত্ব রয়েছে, সেগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে রেভল্যুশনারি গার্ডস পানির ডিস্যালিনেশন প্লান্টে হামলা করে এ অঞ্চলের জনগণকে দুর্ভোগে ফেলতে চায়। প্রতিরোধ সক্ষমতার দিক থেকে যে হুমকি সৃষ্টি হবে, আমরা ঠিক সেই মাত্রায়ই তার জবাব দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আপনারা বিদ্যুতে আঘাত করলে, আমরাও বিদ্যুতে আঘাত করব।’
এছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষা পরিষদের পক্ষ থেকে গতকাল সমুদ্রে মাইন পেতে পারস্য উপসাগরের সব নৌপথ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান মিত্রভাবাপন্ন কয়েকটি দেশ ছাড়া অন্য সব দেশের জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানি প্রতিরক্ষা পরিষদের হুমকি বাস্তবায়িত হলে শুধু হরমুজ প্রণালি নয়, গোটা পারস্য উপসাগরেই সবার জন্য নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইরানের উপকূল বা দ্বীপে হামলার যেকোনো চেষ্টার ফলাফল হবে উপসাগরের সব প্রবেশপথে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাইন স্থাপন। এর মধ্যে ভাসমান মাইনও থাকবে, যা উপকূল থেকেই ছাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে পুরো উপসাগরে দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যত হরমুজ প্রণালির মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।’
যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহৎ জ্বালানি অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এখন এক প্রকার তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেছেন, ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের দুটি জ্বালানি তেল সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে সৃষ্ট গ্যাস সংকট—এ তিনটির সম্মিলিত প্রভাবের চেয়েও গুরুতর।
এদিকে রাশিয়ার পক্ষ থেকেও ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা থেকে বিরত থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গতকাল বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি হবে অপূরণীয় ক্ষতি। রাশিয়া এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রাসঙ্গিক বার্তা দিয়েছে। এ অঞ্চলের চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা সম্ভব।
যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি বাণিজ্য মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ওমান এখন হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তিনি বলেন, ‘এ সংঘাত আমাদের সৃষ্টি নয়। কিন্তু এর ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এভাবে যুদ্ধ চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।’


