
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় চীনসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে : অর্থমন্ত্রী
মার্চ ১০, ২০২৬
সবকিছু স্পষ্ট, সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচনে ভোটের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে: জামায়াত আমির
মার্চ ১০, ২০২৬বর্তমান বিশ্ব এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে। যুদ্ধ, সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং মানবিক সংকট যেন প্রতিদিনই নতুন করে মানুষের জীবনে ক্ষত সৃষ্টি করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সহিংসতা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি—এসব ঘটনা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের ওপর। বিশেষ করে শিশুদের জীবনে এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ রূপে দেখা যায়। কারণ তারা যুদ্ধ বোঝে না, রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার শিকার তারাই বেশি হয়।
সাম্প্রতিক এক বিমান হামলায় ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি স্কুলে প্রায় দুই শতাধিক শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একজন ব্যক্তি একটি শিশুর খণ্ডিত মরদেহ হাতে নিয়ে আহাজারি করছেন। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো মানবতার জন্য গভীর বেদনার প্রতীক। আমাদের কাছে এটি হয়তো একটি সংখ্যা বা পরিসংখ্যান, কিন্তু যেসব পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে, তাদের কাছে এটি আজীবনের এক অসহনীয় ট্র্যাজেডি।
নিহতদের মধ্যে ছয় বছরের শিশু সারার গল্প বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। হামলার পর তার বাবা মোহাম্মেদ শরিয়তমাদার ধ্বংসস্তূপের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, শুধু এই আশায় যে কেউ হয়তো তার মেয়ের খবর জানাবে। তার ভাষায়, “আমার মেয়ে রাজনীতি বোঝে না, যুদ্ধ বোঝে না। তবুও সে কেন এভাবে নিহত হবে?” একইভাবে নয় বছরের শিক্ষার্থী ফাতিমা আল জাহরা মোহাম্মাদ আলীর মা আমিনা আনসারি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধারকারীদের কাছে বারবার জানতে চাইছিলেন—তার মেয়েকে উদ্ধার করা গেছে কি না। এসব দৃশ্য যুদ্ধের নৃশংসতার এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
শুধু সরাসরি হামলায় নয়, যুদ্ধের মানসিক চাপেও বহু শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, অনেক শিশু ভয়াবহ মানসিক চাপ, আতঙ্ক ও ট্রমার কারণে হৃদ্রোগ বা অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্রের গুলিতে মারা না গেলেও যুদ্ধের পরিবেশই তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলেই যে শিশুদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে, তা নয়। যুদ্ধের বাইরে থাকা দেশগুলোতেও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন অনেক ঘটনা সামনে এসেছে, যা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র তুলে ধরে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছর বয়সী শিশু জান্নাতুল নিশা ইরার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। পারিবারিক শত্রুতার জেরে প্রতিবেশী বাবু শেখ নামের এক ব্যক্তি শিশুটিকে চকোলেট ও বেড়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে ধর্ষণের চেষ্টা ব্যর্থ হলে ছুরি দিয়ে তার গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটির বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করে ফিরে আসার দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি আমরা কতটা অসহায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের সমাজ ও বিচারব্যবস্থাকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কেন আমরা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না? কেন অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? কেন সমাজে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে আমরা যথেষ্ট উদ্যোগী হতে পারছি না?
প্রায়শই দেখা যায়, কোনো ঘটনা আলোচিত হলে সাময়িকভাবে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ে, গণমাধ্যমে আলোচনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ঘটনাকে আড়াল করে দেয়। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে পড়ে যায়, আর অনেক অপরাধী প্রভাব, অর্থ বা ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে যায়। এর ফলে সমাজে অপরাধের সংস্কৃতি টিকে থাকে এবং সময়ে সময়ে নতুন নতুন ঘটনার জন্ম দেয়।
এসব ঘটনার প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজের সব শিশু ও অভিভাবকের মনে আতঙ্ক তৈরি করে। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশও এতে বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব চাপ শিশুদের চরম মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। একটি বেসরকারি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ১৯০ জনই স্কুলপড়ুয়া শিশু। এই সংখ্যা কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজিটাল যুগে শিশুরা চারপাশে ঘটে যাওয়া সহিংসতার খবর সহজেই জানতে পারে। যুদ্ধ, হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের মতো বীভৎস ঘটনাগুলো তাদের মানসিক জগতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি পারিবারিক কলহ, সামাজিক চাপ, শিক্ষাগত প্রতিযোগিতা এবং অনিরাপদ পরিবেশও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করে।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে প্রতিটি শিশু একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না; তার যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চাও জরুরি।
বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে কোনো শিশু যদি সহিংসতার শিকার হয়, তা পুরো মানবতার জন্যই লজ্জার বিষয়। তাই দেশ, জাতি, ধর্ম বা রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে শিশুদের অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কেবল বক্তৃতা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।
সারা, ফাতিমা কিংবা ইরার মতো অসংখ্য শিশুর জন্য আমাদের এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের জন্য সুরক্ষিত নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


