ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে অবৈধ ঘোষণা শেষ সময়ে তড়িঘড়ি চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ভুল কি
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
‘শহীদ মিনারে যাওয়া রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেই এসেছি’— জামায়াত আমির
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে অবৈধ ঘোষণা শেষ সময়ে তড়িঘড়ি চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের বড় ভুল কি
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬
‘শহীদ মিনারে যাওয়া রাষ্ট্রীয় আচার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেই এসেছি’— জামায়াত আমির
ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা

বহু বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের অভাব এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সংকট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। সে প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে বলে আশা করা যায়।

ভোটার হিসেবে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পারার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে গর্বের। একসময় বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। প্রার্থীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইতেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতেন। গ্রাম ও শহরের চায়ের দোকানে রাজনৈতিক বিতর্ক চলত, শিশুদের মুখে মুখে শোনা যেত দলীয় স্লোগান। ভোটের দিন পরিবার-পরিজন নিয়ে কেন্দ্রে যাওয়া, রাতে ফলাফলের অপেক্ষা করা এবং বিজয়ী দলের আনন্দ মিছিল—এসবই ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবেশ বদলে গেছে। একাধিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিকে দুর্বল করেছে।

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে বাংলাদেশকে নানা সময়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কাদা ছোড়াছড়ির রাজনীতি, পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে নড়বড়ে করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহিংস রাজনীতি, হামলা-মামলা, গুম-খুন এবং মত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা—যা নাগরিক আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতি অনেক সময় ভয়ের বিষয় হয়ে উঠেছে, উৎসবের নয়।

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ইতিহাসও বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। এবারের নির্বাচন পরবর্তী সময়েও বিচ্ছিন্নভাবে সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। যদিও পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবু দীর্ঘমেয়াদে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক নেতাদের সুস্পষ্ট সহিংসতাবিরোধী অবস্থান, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা রোধে কঠোর ব্যবস্থা অপরিহার্য। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।

নতুন সরকার হিসেবে বিএনপির সামনে এখন বড় দায়িত্ব। তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে দলটির প্রতি সমর্থকদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের নয়, বাস্তবতার বিষয়। তাই সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথে না গিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ সমাজকে হতাশ করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে সরকারের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন—এই তিনটি বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগই পারে পরিস্থিতি সামাল দিতে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনও অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে হলে মানবাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, আচরণগত পরিবর্তনই আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছে। কিন্তু এই যাত্রা টেকসই করতে হলে সরকারকে সংযম, সহনশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করা যেমন ভুল, তেমনি অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিভ্রান্ত করাও বিপজ্জনক। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাফল্য।

গণতন্ত্র কেবল ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রতিদিনের শাসনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়। তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো একটি শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও আস্থাভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। সে পথে অগ্রসর হতে পারলেই এই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন যাত্রার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *