
রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ক্ষমতায় না, ব্যালটে ৫০ শতাংশ
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬
নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে করা রিটের শুনানি আজ
ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি তখন দুই অংকের ঘরে অবস্থান করছিল, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরমভাবে ব্যাহত করছিল। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকার সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে নিয়ন্ত্রণহীন মূল্যস্ফীতিকে চিহ্নিত করেছিল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখে এবং নীতি সুদহার ১৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করে। পাশাপাশি বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
কিছু ক্ষেত্রে সরকার সাময়িক সাফল্যও দেখাতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে গত রমজানে বাজারদর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়। এছাড়া গত বছরের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা ছিল গত ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এতে আশার সঞ্চার হলেও এ হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
বরং সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে মূল্যস্ফীতি আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার বেড়েছে। অক্টোবরে যেখানে হার ছিল ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ, সেখানে নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে। ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং সর্বশেষ জানুয়ারিতে তা পৌঁছেছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব বাজারে এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার মূলত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করেছে। তবে বাস্তবে এই নীতির প্রত্যাশিত প্রভাব পড়েনি। বরং উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি কমেছে।
অর্থনীতির এই শ্লথগতি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা আবার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি একদিকে যেমন বিনিয়োগ কমিয়েছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
গত বছর সবজির বাজার ছিল অস্বাভাবিকভাবে চড়া। শীত মৌসুম শুরু হওয়ার পরও নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ডিসেম্বরের শেষ দিকে কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে চাল, ডাল, চিনি, আটা, মাছ-মাংস ও এলপিজিসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে ইতিবাচক পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে তার সুফল প্রতিফলিত হয়নি। গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, চাল, গম, সয়াবিন তেল, গুঁড়া দুধ ও মসলার দাম কমেছে। পাশাপাশি সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয়ও কমেছে। কিন্তু এসব সুবিধা দেশের ভোক্তারা পাননি। বরং সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশে ব্যাপক আকারে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূল্যস্ফীতি বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাবও বাজারে সরাসরি পড়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে স্পষ্ট হচ্ছে যে, অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ধারাটি শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেনি। ফলে পরবর্তী সরকারের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতিনির্ভর কৌশল যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত নীতি—যার মধ্যে বাজার তদারকি, সরবরাহ বাড়ানো, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। তাই আগামী সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


