
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে চিকিৎসকের ছাড়পত্র পেলেন মিলার
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
প্রবাসীদের ভোটে কারচুপির সুযোগ নেই: ইসি সানাউল্লাহ
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬বৈশ্বিক চিংড়ির বাজারের ৬০-৭০ শতাংশই এখন ভেনামি জাতের দখলে। উচ্চ উৎপাদন ও বর্ধনশীল জাতের এ চিংড়ি চাষে দেশে গবেষণাও হয়েছে সাত-আট বছর।
বৈশ্বিক চিংড়ির বাজারের ৬০-৭০ শতাংশই এখন ভেনামি জাতের দখলে। উচ্চ উৎপাদন ও বর্ধনশীল জাতের এ চিংড়ি চাষে দেশে গবেষণাও হয়েছে সাত-আট বছর। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২২ সালে বাণিজ্যিক ভেনামি চাষের অনুমতি দিয়েছিল সরকার। রফতানি আয়ের সম্ভাবনা দেখে এ খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন উদ্যোক্তারা। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এ শিল্প সম্প্রসারণের। যদিও হঠাৎ করেই বিশেষ জাতের এ চিংড়ি চাষের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অপ্রত্যাশিত এ পদক্ষেপে ভেনামি চিংড়ির উদ্যোক্তারা হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকায় ভেনামি চিংড়ির পোনা এখনো আমদানিনির্ভর। দেশে দু-একটি প্রতিষ্ঠান পোনা উৎপাদন শুরু করলেও সেগুলো গুণগত মানে উত্তীর্ণ নয়। এ পরিস্থিতিতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই সরকার ভেনামির পোনা আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ভেনামি চিংড়ির বাজার সম্প্রসারণেও প্রতিবন্ধকতা আরোপ করেছে। এর মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের চিংড়ির বাজারকে ভারতের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
অবশ্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, ভেনামি চাষের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিরূপণে আরো গবেষণা প্রয়োজন। সেজন্য ভেনামির চাষ সম্প্রসারণ করা সমীচীন হবে না। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বাজারে চিংড়িসহ হিমায়িত খাদ্য রফতানিতে নেতৃত্বের ভূমিকায় আছেন সী মার্ক গ্রুপের কর্ণধার ইকবাল আহমেদ ওবিই। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এ ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি বলব, সরকারের এ সিদ্ধান্ত ভুল ও আত্মঘাতী। গত কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ির চাষ শুরু করেছি। এ খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ভেনামি চাষে বড় অংকের বিদেশী বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা দেশের স্বার্থবিরুদ্ধ।’
জানা যায়, সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তর একটি প্রতিষ্ঠানকে ভারত থেকে ৪২ কোটি ভেনামি চিংড়ির ‘নপলি’ (ডিম থেকে ফোটার পর জীবনচক্রের প্রথম অংশ) আমদানির অনুমতি দেয়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও চূড়ান্ত করে। এতে দেশীয় হ্যাচারিগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে আমদানির অনুমতি বাতিলের দাবি জানায়। ১৪ জানুয়ারি শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সেব) সভাপতি এবং কক্সবাজার-৩ (সদর) আসনের আসন্ন সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী লুৎফর রহমান কাজল সংবাদ সম্মেলন করেন। পরদিনই ভেনামি চিংড়ি আমদানি বন্ধের নির্দেশনা জারি করে সরকার।
গত ১৫ জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, ভেনামি চিংড়ি আমদানিনির্ভর প্রজাতি। এর পোনা আমদানির মাধ্যমে রোগ সংক্রমণ, পরিবেশ দূষণ এবং দেশীয় বাগদা ও গলদা চিংড়িসহ স্থানীয় প্রজাতির ওপর বিরূপ প্রভাবের ঝুঁকি রয়েছে।’
সরকারের উদ্যোগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি ও রিভারাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর চিংড়ির বাজারে ভেনামির হিস্যা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। বৈশ্বিক চিংড়ির বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা একেবারেই নগণ্য। আমরা হিস্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। ভেনামি চাষ মার্কেটে আসায় দেশের চিংড়ি চাষের রফতানিও বৃদ্ধি পায়। মাঝপথে পোনা আমদানি বন্ধ করায় চিংড়ি রফতানি কার্যক্রম অনেক পিছিয়ে যাবে।’
চিংড়ি শিল্পে অন্তত ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন এমইউসি ফুডসের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শ্যামল দাস। ভেনামি চাষ সম্প্রসারণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এর আগে পাঁচ বছর গবেষণা করার পর এখন আবার কেন গবেষণার প্রয়োজন পড়ল? তারা এ খাতের সম্প্রসারণ কেন চায় না?’
২০২১ সালে সরকারি উদ্যোগে খুলনার পাইকগাছাতে ছয়টি পুকুরে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে পরীক্ষামূলক ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হয়। ৭ লাখ ৬২ হাজার পিএল (পোস্ট লার্ভা) পুকুরে ছাড়া হয়। তবে চাষের পর আহরিত চিংড়ি ছিল ৫ লাখ ৯৮ হাজার। উৎপাদন পাওয়া যায় ১৩ হাজার ৮৯৬ কেজি। যার বিক্রয়মূল্য ছিল ৬৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। প্রকল্পে সব মিলিয়ে খরচ ধরা হয় ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার ১৬১ টাকা। এতে লাভ থাকে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৯ টাকা। নিজস্ব জমিতে খামার হলে লাভ ধরা হয় ১৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা। ওই চাষের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনামি চিংড়ি অধিক ঘনত্বে চাষ করা যায় এবং ৯০-১২০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ফসল পাওয়া যায়। পাশাপাশি পিএল, খাবার ও উপকরণ সহজলভ্য হলে ভেনামির উৎপাদন ব্যয় আরো কমে আসবে এবং অধিক লাভ সম্ভব। পরে ২০২২ সালে কারিগরি কমিটির সভায় দেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, ভারত, একুয়েডরসহ চিংড়ির বিশ্ববাজারে যেসব দেশ এগিয়ে আছে, তারা সবাই ভেনামি চিংড়ি চাষ ও রফতানির মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। অথচ বাংলাদেশে ভেনামি চাষ শুরুই হয়েছে ভারতের ১২ বছর পর। আধুনিক চাষে ভেনামির উৎপাদন হেক্টরপ্রতি আট থেকে ২০ টন। বিপরীতে বাংলাদেশে গলদার উৎপাদন হেক্টরপ্রতি মাত্র দশমিক ৫২ টন এবং বাগদার উৎপাদন দশমিক ৩৩ টন।
ভারতের সামুদ্রিক পণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে হেক্টরপ্রতি ১৪ গুণ বেশি চিংড়ি উৎপাদন হয়। ইন্দোনেশিয়ায় এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬ টন, ভিয়েতনামে ১ দশমিক ৪৭ টন।
ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশনের (ডব্লিউআইটিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে চিংড়ি থেকে ভারতের রফতানি আয় ছিল ৮৮ কোটি ডলার। ২০০৮ সালে দেশটিতে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষের অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১০ সালের মধ্যেই চিংড়ি রফতানি থেকে দেশটির আয় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে খাতটি থেকে ভারতের রফতানি আয়। ২০২৪ সালে আয় হয়েছে ৪২৯ কোটি ডলার। একই চিত্র অন্যান্য দেশেরও। ২০০০ সালেও ভিয়েতনামের চিংড়ি রফতানি থেকে বার্ষিক আয় ছিল ৬২ কোটি ডলার। ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১৮০ কোটি ডলারে। একই সময়ের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার আয় ৯৩ কোটি ডলার থেকে ১০৬ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থান দিনে দিনে আরো নিম্নগামী হয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশ চিংড়ি থেকে রফতানি আয় ছিল ৫১ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেটি নেমে আসে ২৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলারে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ২৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৩০ কোটি ডলার।
সার্বিক বিষয়ে জানতে গতকাল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবেরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার পর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে আমি ওই সভায় ছিলাম না। আমার হাতে সব ডকুমেন্টসও এখন নেই। সেজন্য অফিসে না গিয়ে এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয়া সম্ভব নয়।’


