তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন: হাসিনার শাসনে ৬০০০ গুম
জানুয়ারি ৭, ২০২৬
মাওলানা ভাসানীর কবর জিয়ারতের মধ্যদিয়ে কর্মসূচি শুরু করবেন তারেক রহমান
জানুয়ারি ৭, ২০২৬
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন: হাসিনার শাসনে ৬০০০ গুম
জানুয়ারি ৭, ২০২৬
মাওলানা ভাসানীর কবর জিয়ারতের মধ্যদিয়ে কর্মসূচি শুরু করবেন তারেক রহমান
জানুয়ারি ৭, ২০২৬

ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে: আন্তর্জাতিক মানের সড়ক যোগাযোগে নতুন যুগে বাংলাদেশ

রাজধানী ঢাকায় না ঢুকেই দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলে যাতায়াতের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। গাজীপুরের ভোগড়া থেকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর সড়ক—যা “ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে” নামে পরিচিত—বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অনন্য অধ্যায় যোগ করতে চলেছে।

এই বহুল প্রত্যাশিত এক্সপ্রেসওয়ে শুধু রাজধানীর যানজট নিরসনেই ভূমিকা রাখবে না; বরং এটি হয়ে উঠবে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে পণ্য পরিবহনের আধুনিক করিডোর। এতে সময়, জ্বালানি ও অর্থ সাশ্রয় হবে; দেশের আঞ্চলিক অর্থনীতিতে আসবে নতুন গতি।

২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP) চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা। ২০২২ সালের ১৫ মে থেকে কার্যক্রম শুরু হয় এবং ২৫ বছরের মেয়াদি এ চুক্তি চলবে ২০৪৭ সালের মে মাস পর্যন্ত।

চার লেনের নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ সড়ক হিসেবে তৈরি হওয়া এক্সপ্রেসওয়ের প্রস্থ হবে ২০.২ মিটার; পাশাপাশি দুই পাশে ৪.৮ থেকে ৭.৩ মিটার প্রশস্ত সার্ভিস সড়কও থাকবে। এই সড়কটি একসাথে সংযুক্ত করবে দেশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক—ঢাকা-চট্টগ্রাম (N1), ঢাকা-সিলেট (N2), ঢাকা-ময়মনসিংহ (N3) এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল (N4)। ফলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব, পূর্ব এবং উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সরাসরি দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

প্রকল্পের অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ভোগড়া থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার মূল সড়ক এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সার্ভিস সড়কের কাজ শেষ হয়েছে। ধীরাশ্রম ও মীরেরবাজারে দুটি রেলওয়ে ওভারপাস, কাঞ্চন, নাগদা ও উলুখোলায় আটটি সেতু নির্মিত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, দশ কিলোমিটার অংশ সম্পন্ন হলে আংশিক চালুর সুযোগ রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট থেকে ভোগড়া-পূর্বাচল ১৮ কিলোমিটার অংশে টোল প্রদানের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ আসলাম আলী বলেন, “ভোগড়া থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত অংশটি চালুর পর ইতোমধ্যেই পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর চলাচল সহজ হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের জটিলতায় প্রকল্পের পূর্ণ সমাপ্তি এক বছর পিছিয়েছে। ২০২৬ সালের জুন নাগাদ পুরো এক্সপ্রেসওয়ে চালু হবে বলে আশা করছি।”

রাজধানীর যানজট বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় বাধা। প্রতিদিন হাজারো ট্রাক ও ট্রেইলার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে উত্তরবঙ্গে পণ্য নিয়ে যেতে ঢাকার ভেতর দিয়ে যাতায়াত করে, ফলে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে এই ভারী যানবাহনগুলোকে আর রাজধানীতে প্রবেশ করতে হবে না। আগে যেখানে দুই ঘণ্টা সময় লাগত, এখন একই দূরত্ব অতিক্রম করা যাবে মাত্র আধা ঘণ্টায়। এতে যানজট কমবে, জ্বালানি খরচ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার ৬০ শতাংশই পণ্যবাহী। প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে এ সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।

ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়েতে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক “সেমি-রিজিড পেভমেন্ট” প্রযুক্তি, যেখানে কোনো ইট ব্যবহার করা হয়নি। ফলে সড়কটি প্রচলিত ফ্লেক্সিবল সড়কের তুলনায় অধিক টেকসই হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমবে।
প্রকল্পে নির্মিত হচ্ছে— ৬টি সেতু, ২টি রেলওয়ে ওভারপাস, ৩৯টি নতুন কালভার্ট, ৪৬টি পুরোনো কালভার্ট সংস্কার, ১২টি চ্যানেল, ৮টি পদচারী ওভারপাস।

পুরো সড়কজুড়ে থাকছে নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং ৮০ কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো।

ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে শুধু একটি সড়ক নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক মহাকৌশল। এই করিডোর চালু হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমে যাবে, যোগাযোগ হবে আরও গতিশীল, এবং রাজধানীর ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
স্থানীয় অর্থনীতিও প্রাণ ফিরে পাবে—নতুন ব্যবসা, গুদামঘর, হালকা শিল্প ও লজিস্টিক পার্ক গড়ে উঠবে এই সড়ককে ঘিরে। বিশেষ করে ঈদ ও উৎসবমুখর সময়ের যাত্রা হবে আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক।

ঢাকা-বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি “বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরাম”-এর বাস্তব সহযোগিতা প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত এবং এশীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে।

জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর বাইপাস কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং এটি দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে ঢাকার যানজট কমবে, দেশের শিল্পবাণিজ্য হবে আরও প্রাণবন্ত, আর বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগে প্রবেশ করবে এক নতুন যুগে—আন্তর্জাতিক মানের দ্রুত, নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এক সড়ক যুগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *