ইসরায়েলের কেৎজিয়েত কারাগারে রাখা হয়েছে শহিদুল আলমদের
অক্টোবর ১০, ২০২৫
সাহিত্যে নোবেল পেলেন হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক লাজলো ক্রাজনাহোরকাই
অক্টোবর ১০, ২০২৫
ইসরায়েলের কেৎজিয়েত কারাগারে রাখা হয়েছে শহিদুল আলমদের
অক্টোবর ১০, ২০২৫
সাহিত্যে নোবেল পেলেন হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক লাজলো ক্রাজনাহোরকাই
অক্টোবর ১০, ২০২৫

বিপুল ব্যয়ে নির্মিত মহাসড়কে বাড়ছে খানাখন্দ সংস্কারে ধীরগতি

বাংলাদেশে সড়ক-মহাসড়কের যত শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে, তার মধ্যে সবার ওপরে আছে জাতীয় মহাসড়ক। সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ আর উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় এ শ্রেণীর মহাসড়ক। দেশজুড়ে বিস্তৃত জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ৪ হাজার ২৯৪ কিলোমিটার।

বাংলাদেশে সড়ক-মহাসড়কের যত শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে, তার মধ্যে সবার ওপরে আছে জাতীয় মহাসড়ক। সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ আর উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় এ শ্রেণীর মহাসড়ক। দেশজুড়ে বিস্তৃত জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ৪ হাজার ২৯৪ কিলোমিটার। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোয় বেড়েছে ভাঙাচোরা আর খানাখন্দের পরিমাণ। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-সিলেটসহ বিভিন্ন জাতীয় মহাসড়কে সৃষ্ট খানাখন্দে যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়ছে মানুষ। বিঘ্নিত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। ধীরগতির সংস্কারকাজ মহাসড়কগুলোকে আরো বেহাল করে তুলেছে।

যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলো নির্মাণ করা হয়েছে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এসব সড়কের নির্মাণ ব্যয় চার-পাঁচ গুণ। যেকোনো মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এত টাকা খরচ করে নির্মাণ করা মহাসড়কে ভাঙাচোরা ও খানাখন্দ থাকা দুঃখজনক বলে মনে করছেন তারা।

জাতীয় মহাসড়কগুলোয় খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা থাকার কথা স্বীকার করেছেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরাও। এজন্য অবশ্য তারা ‘‌চলতি বছরের প্রলম্বিত বর্ষা’কে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, বর্ষাকালে সড়কের স্থায়ী মেরামতকাজ করা হয় না। এজন্য এখন ভাঙাচোরার পরিমাণ বেশি।

দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। মেঘনা সেতুর দুই প্রান্তে থাকা মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। বিশেষ করে মেঘনা টোলপ্লাজার সামনে দুটি লেনের প্রবেশপথে পিচ উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে টোল লাইনে প্রবেশের সময় যানজটে পড়ছে যানবাহন। এর বাইরে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, বিশ্বরোড, নন্দনপুর, মোস্তফাপুর, চাষাপাড়া, ধনাইতরী, সুয়াগাজীসহ মিয়াবাজার, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, মিরসরাই, সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন অংশে রয়েছে ছোট-বড় গর্ত। নারায়ণগঞ্জ অংশে এক বছরের বেশি সময় ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। ফলে গাড়ির চাপ একটু বাড়লেই নারায়ণগঞ্জ থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত অংশে দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিদ্যমান গর্ত ও খানাখন্দের কারণে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না বলে জানিয়েছেন এ পথে চলাচল করা গ্রীনলাইন পরিবহনের চালক আব্দুল মতিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে যে দূরত্ব, তাতে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে যাতায়াত সম্ভব। কিন্তু এখন রাস্তা খারাপ হওয়ায় যাতায়াতে ৬ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। আর কোনো কারণে যানজট বাধলে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।’

চার লেনে উন্নীতের পর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উদ্বোধন করা হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। মহাসড়কটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এর বাইরে ২০১৯-২৫ সাল পর্যন্ত মহাসড়কটি রক্ষণাবেক্ষণে আরো প্রায় ৮০০ কোটি টাকা খরচ করেছে সওজ অধিদপ্তর।

২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৬ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। চালুর মাত্র দুই বছরের মাথায় এ সড়কের অন্তত ২৫ কিলোমিটার এলাকায় বড় বড় খানাখন্দ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক ডেবে গেছে। ভাঙাচোরা ও ডেবে যাওয়ার কারণে এ মহাসড়ক ব্যবহারকারী যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। খানাখন্দের কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

ভাঙাচোরা আর খানাখন্দ রয়েছে ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কেও। মহাসড়কটির ফরিদপুর সদরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার অংশ বেহাল অবস্থায় রয়েছে। সড়কের পিচ উঠে গিয়ে গর্ত আর খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। জায়গায় জায়গায় রয়েছে ভাঙাচোরা। রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। মহাসড়কটির এ বেহাল দশার কারণে যান চলাচল যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও।

দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোর মধ্যে বর্তমানে ঢাকা-সিলেট ও টাঙ্গাইল-রংপুরে বর্তমানে উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে ধীরগতির উন্নয়নকাজের কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজটের ভোগান্তিতে পড়ছে মানুষ। যানবাহনের চাপ বাড়লে যানজট দেখা দিচ্ছে উত্তরাঞ্চলের টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কেও। ঢাকা-ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও রয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ, যেগুলোয় বিঘ্নিত হচ্ছে যান চলাচল।

জাতীয় মহাসড়কগুলো বর্তমানে মহাদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বাংলাদেশের প্রতিটা জাতীয় মহাসড়ক আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে চার-পাঁচ গুণ অর্থ ব্যয় করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সড়কগুলো নির্মাণের সময় কাজের গুণগত মান কর্তৃপক্ষ কতটা নজরদারি করতে পেরেছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রয়োজনীয় জনবল, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, যন্ত্রপাতি না থাকলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার আর নিম্নমানের নির্মাণকাজের কারণে এ সড়কগুলো নির্ধারিত লাইফলাইনের অনেক আগেই নষ্ট হতেও দেখা যাচ্ছে।’

নির্মাণকারী সংস্থা হিসেবে নির্মাণ, উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণকাজ তদারক করা সওজ অধিদপ্তরের প্রধান দায়িত্ব, যা সংস্থাটি পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘‌যে সড়ক ২০ বছরের জন্য নকশা করে নির্মাণ করা হলো, সেই সড়ক যদি এক বছরের মাথায় নষ্ট হয় তাহলে অবশ্যই এ কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে কাজটি করা হয় না।’

জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়ক মিলিয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নেটওয়ার্কভুক্ত সড়কের পরিমাণ ২২ হাজার ৭১৯ কিলোমিটার। সংস্থাটির এক অভ্যন্তরীণ জরিপে উঠে এসেছে, নেটওয়ার্কভুক্ত ১ হাজার ৪৭৪ কিলোমিটার মহাসড়ক খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী সড়ক বিভাগে ২২৯ কিলোমিটার সড়ক ভাঙাচোরা। একইভাবে রংপুর সড়ক বিভাগে ১৯৪ কিলোমিটার, চট্টগ্রামে ১৮৬, কুমিল্লায় ১৬৭, ময়মনসিংহে ১৫০, সিলেটে ১৪৮, ঢাকায় ১৪৩, বরিশালে ১১৯, গোপালগঞ্জে ৭০ ও খুলনা সড়ক বিভাগে ৬৮ কিলোমিটার সড়ক খারাপ অবস্থায় রয়েছে।

দেশে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি জাতীয় মহাসড়ক রয়েছে এবং এ সড়ক নেটওয়ার্ক সবসময় ভালো অবস্থায় রাখা অত্যন্ত কঠিন কাজ বলে দাবি করেছেন সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কয়েকটি মহাসড়কে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। নতুন করে আরো কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকাজ আরো গতি পাবে।’

চলতি বছর বর্ষার কারণে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এ বছর এপ্রিলে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। ‌বৃষ্টির সময় আমরা স্থায়ী কাজ করি না। এজন্য কিছু জায়গায় সড়ক খারাপ হয়েছে। তবে আমরা বসে নেই। সড়ক নেটওয়ার্ক ঠিক রাখতে দেশজুড়ে আমাদের প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *