পবিত্র ঈদুল আজহা: ত্যাগই কুরবানির মূল কথা
জুন ৮, ২০২৫
ব্যস্ত তৎপরতায় নির্বাচন কমিশন, দ্রুতই সরাতে হবে আইনি বাধা
জুন ২০, ২০২৫
পবিত্র ঈদুল আজহা: ত্যাগই কুরবানির মূল কথা
জুন ৮, ২০২৫
ব্যস্ত তৎপরতায় নির্বাচন কমিশন, দ্রুতই সরাতে হবে আইনি বাধা
জুন ২০, ২০২৫

ইউনূস-তারেকের বিচক্ষণতা : স্বস্তিতে দেশ

জাকির হোসেন:

একটি বৈঠকেই পালটে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। কেটে গেছে অনিশ্চয়তার সব কালোমেঘ, সোনালি সূর্য হেসে উঠেছে। তীব্র দাবদাহের পর ঝুম বৃষ্টির মতো স্বস্তি নিয়ে এসেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠকটি সব সংশয়, অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। বলা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মধ্যকার দুই ঘণ্টার এ ঐতিহাসিক বৈঠক ষড়যন্ত্রকারীদের ‘গেম ওভারের’ মুহূর্ত। উইন-উইন সিচুয়েশন সত্যিকার অর্থেই কেবল উভয়ের জন্যই নয়, সমগ্র দেশের জন্য বিজয় এনেছে।

জাতি প্রবল আগ্রহ নিয়ে এ বৈঠকের অপেক্ষায় ছিল। বৈঠকের কথা ঘোষণা করার পর থেকেই প্রতিটি মুহূর্তের দিকে নজর ছিল সবার। বৈঠকের প্রধান ইস্যু ছিল নির্বাচন। আর এর সমাধান হয়েছে খুবই সাবলীলভাবে। নির্বাচন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে আয়োজন করার সম্ভাবনার কথা বলে দুই পক্ষই ছাড় দিয়েছে। ‘ডিসেম্বরেই নির্বাচন হতে হবে’-সেখান থেকে সরে এসেছে বিএনপি। ‘এপ্রিল ঘোষণা দিয়েছি, তাই এপ্রিলেই নির্বাচন হতে হবে’-সেখানে অনড় থাকেনি অন্তর্বর্তী সরকার। দুজনই বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এ কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তারেক রহমান ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। এ বৈঠকে এ দুই নেতা প্রমাণ করলেন, বাংলাদেশের মানুষ এখনো প্রয়োজনের সময় ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তারা নিতে পারে যে কোনো সিদ্ধান্ত। তারা আবারও প্রমাণ করলেন, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।

বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণাটি সংক্ষিপ্ত, তবে আশাজাগানিয়া। এতে বলা হয়, ‘আজ (শুক্রবার) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন সফররত প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে তাদের বৈঠক হয়।’

‘তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও মনে করেন, ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়।’

যৌথ ঘোষণায় আরও বলা হয়, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালে রোজা শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।’

‘তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার এ অবস্থানকে স্বাগত জানান। ধন্যবাদ জানান দলের পক্ষ থেকে। প্রধান উপদেষ্টাও তারেক রহমানকে ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানান।’

বৈঠকের শুরুতেই ড. ইউনূস এবং তারেক রহমান উভয়েই হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট ছিলেন। এটি যাতে সফল হয়, সেদিকে দুজনই আন্তরিক ছিলেন। বৈঠক শুরুর আগে দুজনের কথোপকথনের দিকে তাকালেই তা সহজেই বোঝা যায়।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান হোটেলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টা তার সঙ্গে প্রথমে কুশল বিনিময় করেন। সে সময় ওয়েলকাম বলে ড. ইউনূস তারেক রহমানের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেন। বিএনপি মিডিয়া সেল ওই মুহূর্তের একটি ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, হ্যান্ডশেক করার পর প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমান কুশলাদি বিনিময় করছেন। তারেক বলেন, ‘ইটস অ্যা রিয়েল অনার ফর মি।’ প্রধান উপদেষ্টাকে ঈদের শুভেচ্ছাও জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ আরও অনেকে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সবার পরিচয় করিয়ে দেন। সে সময় ড. ইউনূস সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেন। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন, জানতে চান শরীর কেমন আছে। উত্তরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান, ‘চলছে, টেনেটুনে।’

এ সময় তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সালাম পৌঁছে দেন। বলেন, ‘আম্মা সালাম জানিয়েছেন।’ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘উনাকেও আমার সালাম দেবেন।’

এ পর্যায়ে তাদের লন্ডনের আবহাওয়া নিয়েও কথা বলতে শোনা যায়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আবহাওয়াটা খুব ভালো, যে ক’দিন আমি এখানে আছি, আবহাওয়াটা বেশ প্লেজেন্ট। খুবই এনজয় করলাম। সামনে পার্ক।’

তারেক রহমান জানতে চান, প্রধান উপদেষ্টা পার্কে হাঁটতে গিয়েছিলেন কিনা। উত্তরে উপদেষ্টা জানান, এখানে পরিবেশ খুব ভালো, হাঁটার অনেক জায়গা।

এমন সূচনার পর অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। তবে দুই নেতার প্রথম সাক্ষাৎ এর চেয়ে ভালো আর কীভাবে হতে পারে!

অবশ্য এটাও ঠিক, ইউনূস ও তারেক কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। ফ্যাসিবাদের আমলে দুজনই ভয়াবহ রকমের নিগৃহীত হয়েছেন। ভুয়া, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় দুজনই দুঃসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ কী ভয়াল হতে পারে, তা দুজনই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের পর তারেকের ওপর যে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল, তা কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। মৃত্যুও হতে পারত তার। মুক্তির পর দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। আর বৃদ্ধ বয়সেও জেলে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন ড. ইউনূস। বিচার-প্রহসনে তাকে নিয়মিত সিঁড়ি বেয়ে আটতলায় যেতে হয়েছে হেঁটে। পরিকল্পিতভাবে আদালত ভবনের লিফট বন্ধ রাখা হতো। তার বিরুদ্ধে ফরমায়েশি রায়ও দেওয়া হয়েছিল। ফলে বাকি জীবন কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে তার মৃত্যুবরণ করাও অস্বাভাবিক ছিল না। ফলে ফ্যাসিবাদকে চিরদিনের জন্য নির্মূল করার প্রত্যয় তাদের চেয়ে আর কার থাকতে পারে। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা যে কত প্রয়োজন, তা তাদের চেয়ে বেশি কে বুঝবে? এই বৈঠকেও বোঝা গেল, তারা অর্জিত সাফল্য অটুট রাখতে বদ্ধপরিকর, প্রয়োজনে সর্বোচ্চ মাত্রায় ছাড় দিতে প্রস্তুত।

আলোচনায় সত্যিকারের একজন জাতীয় নেতার মতো আত্মপ্রকাশ করেছেন তারেক রহমান। তার গাড়ি থেকে নামা, ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করা, অভিবাদন জ্ঞাপন, কথা বলা, শব্দচয়ন, বসার ভঙ্গি-সবকিছুতেই ছিল একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদের প্রতিমূর্তি। গাম্ভীর্য, রাজসিকতা, সাবলীলতা-সব মিলিয়ে ভরসার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি। লন্ডনে বৈঠক সফল হওয়ার মাধ্যমে তারেক রহমান তার রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণ প্রমাণ করেছেন। আবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বৈঠকে না থেকেও পুরোপুরি উপস্থিত ছিলেন। তিনি যে এখন আর কোনো দলের নন, পুরো দেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, তার একটি কথাতেই যে দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যেতে পারে, গত কয়েকদিনে তার ভূমিকায় আবারও তা ফুটে উঠেছে। পুরো জাতি তার দিকে তাকিয়ে ছিল, তিনি জাতিকে নিরাশ করেননি।

আবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চার দিনের লন্ডন সফরটিকেও খাটো করে দেখার উপায় নেই। এতে বহুমাত্রিক অর্জন হাসিল হয়েছে। সফরকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠক ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা রাজা চার্লসের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন, ব্রিটেনে শেখ হাসিনার শীর্ষ এক সহযোগীর ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি জব্দ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালিয়েছেন।

তাছাড়া এ বৈঠকের মাধ্যমে আজ বাংলাদেশপন্থিদের জয়ের পথ সুগম হয়েছে। পরাজিত হয়েছে অন্তর্ঘাত চালানোর দুঃস্বপ্ন দেখা লোকজন। এ বোঝাপড়া জুলাই ঘোষণাপত্র, সংস্কার, বিচার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রশ্নে যদি অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের বিজয় সুনিশ্চিত।

সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন দুই নেতা। তারা যে বার্তা দিয়েছেন, তা হলো, এখন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র চর্চার বিষয়। একে অপরের প্রতি বিষোদগার না করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।

 

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Old
Old

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *